'চোখের তলায় সূর্য ডুবেছে তোমার, আয়না দেখেছ? রাত না জেগে ঘুমাতেও তো পারো!', দেখা হলেই প্রথম কথা এটাই বলতে তুমি প্রত্যেকবার।
দেখা বলতে ওই সপ্তাহে একটা ছুটির দিন, রোববার। আমি প্রত্যুত্তরে একটা শান্ত হাসি হাসতাম আর বলতাম 'কী সুন্দর লাগছে তোমায়! কত কিলো মেকআপ লাগিয়েছো বলতো?'
চিমটি কেটে, আমার হাত থেকে হেলমেটটা নিয়ে মাথায় পরে নিতে তুমি, কিন্তু হেলমেটের ক্লিপটা কিছুতেই আটকাতে পারতে না। একগোছা এলোমেলো চুল তোমার মুখে ঠোঁটে এসে পড়তো, তুমি বিরক্ত হয়ে হেলমেট সমেত মুখটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলতে, 'ক্লিপটা আটকে দাও না...'
বাইকের পিছনের সিটে বসেই তুমি আগে চিপ্পি করে একবার জড়িয়ে ধরতে আমায়, একটা লম্বা নিশ্বাস নিতে, ঠোঁটে করে আলতো চুমু খেতে আমার পিঠে আর তারপর বলতে, 'কি ডিও মেখেছো বলতো?'
আমি আবার হাসতাম আর উত্তর দিতাম, 'দুদিন স্নান করিনি, তারই গন্ধ..', আবার একটা চিমটি জুটতো কপালে।
আগে মন মিশে একাকার হয়, তারপর মেশে আঙুল। তোমার আঙুলের ফাঁকে আমার পাঁচটা আঙুল মিশে গেলে রামধনু উঠতো মনের আকাশে। ময়দানে কতবার তোমার কোলে মাথা রেখে ধ্রুবতারা দেখেছি। আকাশকে ভালোবেসে আজন্মকাল জ্বলছে সে।
তোমায় সামনে থেকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজলেই আমার নিজেকে লতাগাছ মনে হতো। যেন তুমি ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্বই নেই। তোমার চুল থেকে ভেসে আসা মিষ্টি ঘ্রাণে আমি মাধবীলতার মতো ফুটে উঠতাম। মনে হতো থমকে যাক ঘড়ির কাঁটা, পৃথিবী ভুলে যাক তার ঘূর্ণনের নিয়ম কানুন। এই আবেশ চলমান হোক স্রেফ,এই আবেশ যেন শেষ না হয়। খানিকটা পর তুমি বলতে, 'ছাড়বে না?'
আমি হাসতাম, আর বলতাম 'উঁহু, ঘুম পাচ্ছে, তুমি দিন দিন ফুলে ফুলে বালিশ হয়ে বেশ আরামদায়ক হয়েছ..'
আবার একটা চিমটি।
আমরা বহুবার অন্ধকার সিনেমা হলে ঠোঁট স্পর্শ করেছি একে অপরের। সারা মুখে গালে ঠোঁটে রেখেছি আদরের ছাপ। তোমার বুকে মাথা রেখে স্ক্রিনের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকেছি। 'ধক্.. ধক্..ধক্.. ধক্..', তোমার বুকের ভিতর থাকা আসা এই আওয়াজটাই আমার বেসুরো জীবনের সা রে গা মা পা ধা নি সা। আমি আরও গভীরে ডুবে যেতাম, আরও, আরও। মায়ের মতো পাঁচটা আঙুল বিলি কাটতো আমার মাথায়.. আরামে ঘুম নেমে আসতো চোখের পাতায়। তোমায় কখনো বলা হয়নি, তোমার বুকে রোজ ঘুমালে, আমার চোখের তলায় সূর্য কক্ষনো ডুববে না।
আজ প্রায় হপ্তা তিনেক হলো, আমাদের দেখা হয়নি। হয়নি কারণ পৃথিবীর গভীর একটা অসুখ হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। সারা বিশ্বজুড়ে অন্তত ১৭৫টা দেশের মানুষ তোমার আর আমার মতই গৃহবন্দী।
আচ্ছা ওরাও কী আমাদের মতোই ছটফট করছে সমস্তটা ঠিক হয়ে যাওয়ার জন্য! ওরাও কী অপেক্ষা করছে সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য! হাত ধরার জন্য! জড়িয়ে ধরার জন্য!
তুমি রোজ রাতে ম্যাসেজে জিজ্ঞেস করো, 'কবে দেখা হবে আমাদের?'
আমি সেই বিখ্যাত উত্তরটা একটুও বিকৃত না করে লিখি, 'যুদ্ধ শেষ হলে।'
তুমি আবার জিজ্ঞেস করো, 'কবে হবে যুদ্ধ শেষ?'
আমি বলি, 'আমাদের দেখা হলে..'
শোনো, নিজের খেয়াল রাখো। আমাদের দেখা হবে, খুব শীঘ্রই...